কী ভড়কে গেলেন?
এতদিন সবখানে পড়ে এসেছেন, জেনে এসেছেন, শুনে এসেছেন যে উইন্ডোজের মত
লিনাক্সও একটা অপারেটিং সিস্টেম; আর আজকে আমার মত এক চুনোপুটি কিনা বলছে
যে লিনাক্স কোন অপারেটিং সিস্টেম না! আসলেই ব্যাপারটা তাই।
লিনাক্স কোন অপারেটিং সিস্টেম না। প্রত্যেকটা অপারেটিং সিস্টেমের একটা
“প্রাণ ভোমরা” থাকে যা কিনা ঐ অপারেটিং সিস্টেমের মূল অংশ। লিনাক্স হচ্ছে
সেই “প্রাণ ভোমরা”। এই প্রাণ ভোমরাকে বলা হয় “কার্নেল“, যা কিনা কোন
অপারেটিং সিস্টেমের কেন্দ্রীয় অংশ, যা বিভিন্ন এ্যাপ্লিকেশন ও
হার্ডওয়্যারের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করার মাধ্যম হিসেবে কাজ করে এবং যাকে
ছাড়া কোন অপারেটিং সিস্টেম তৈরি করা সম্ভব নয়। অর্থাৎ লিনাক্স হচ্ছে আসলে
কার্নেল। প্রত্যেকটা অপারেটিং সিস্টেমেই এই কার্নেল জিনিসটা থাকে। উইন্ডোজ
বা ম্যাকেও কার্নেল আছে। উইন্ডোজ এক্সপি, ভিসতা বা সেভেনের কার্নেলের নাম
এনটি (NT); ম্যাক ওএস এর কার্নেলের নাম এক্সএনইউ (XNU)। কার্নেলের সাথে
বিভিন্ন এ্যাপ্লিকেশন ও প্রোগ্রাম যোগ করে বানানো হয় অপারেটিং সিস্টেম। সহজ
ভাষায় বললে,
কার্নেল + (এ্যাপ্লিকেশন, প্রোগ্রাম, সফটওয়ার ইত্যাদি) = অপারেটিং সিস্টেম
উইন্ডোজের কার্নেল বিনাপয়সায় পাওয়া তো যায়ই না এমনকি টাকা খরচ করলেও
মাইক্রোসফট থেকে পাওয়া যায়না। তাই কেউ ইচ্ছা করলেই উইন্ডোজের কার্নেলের
সাথে বিভিন্ন সফটওয়ার জুড়ে দিয়ে নিজের মত কোন অপারেটিং সিস্টেম বানাতে
পারেনা। ফলে মাইক্রোসফট ছাড়া আর কেউ উইন্ডোজ কার্নেলের উপর নির্মিত কোন
অপারেটিং সিস্টেম বানাতে পারেনা।
লিনাক্স কার্নেল বিনা পয়সায় পাওয়া যায়, তাই যে কেউ সেটার সাথে বিভিন্ন
প্রোগ্রাম জুড়ে দিয়ে একটা অপারেটিং সিস্টেম বানাতে পারে। শুধু তাই না
ইচ্ছা করলে সেই কার্নেলকে আপনি আপনার মত পরিবর্তন করে ব্যবহার করতে
পারবেন। তাই দেখা যায় বিভিন্ন ব্যাক্তি/কম্পানি লিনাক্স কার্নেল দিয়ে
নিজেদের মত করে অপারেটিং সিস্টেম বানায়। যেমন রেড হ্যাট কোম্পানি লিনাক্স
কার্নেল ব্যবহার করে যে অপারেটিং সিস্টেম বানায় সেটার নাম রেডহ্যাট
লিনাক্স। ক্যানোনিকাল লিনাক্স ব্যবহার করে যে অপারেটিং সিস্টেম বানায় তার
নাম উবুন্টু। নভেল লিনাক্স দিয়ে বানায় স্যুযে। লিনাক্সের উপর নির্ভর করে
বানানো এরকম আরো অনেক অপারেটিং সিস্টেম পাওয়া যায়। রেডহ্যাট, উবুন্টু বা
স্যুযে প্রত্যেকেই আলাদা আলাদা স্বয়ংসম্পূর্ণ অপারেটিং সিস্টেম। এদের
মধ্যে মিল হচ্ছে এদের কার্নেলটা একই, সেটা হল লিনাক্স। তাই এসব অপারেটিং
সিস্টেমকে বলা হয় “লিনাক্স-বেজড অপারেটিং সিস্টেম”, তবে সংক্ষেপে এদেরকে
সাধারণভাবে “লিনাক্স”ও বলা হয়ে থাকে। তাই লিনাক্স দিয়ে আসলে কোন অপারেটিং
সিস্টেমকে বোঝায়না বরং একধরনের বিশেষ অপারেটিং সিস্টেমের গ্রুপকে বোঝায়
যাদের কার্নেলের উৎস একই। অনেক সময় এদেরকে “লিনাক্স ডিস্ট্রো”ও বলা হয়।
কারণ লিনাক্স বেজড অপারেটিং সিস্টেমগুলো সাধারণত ফুল-প্যাকড হয়েই আসে,
অর্থাৎ লেখালেখি করার জন্য সম্পূর্ণ অফিস স্যুট, আঁকাআঁকি করার সফটওয়ার,
অডিও-ভিডিও সফটওয়ারসহ একজন ব্যবহারকারির দরকারী প্রায় সব সফটওয়ারই আগে
থেকেই প্যাকড হয়ে আসে, ফলে উইন্ডোজের মত অপারেটিং সিস্টেম ইন্সটল করার পর
লেখালেখি করার জন্য এমএসঅফিস ইন্সটল করতে হয়না। তাছাড়া অনেকগুলো লিনাক্স
বেজড অপারেটিং সিস্টেম আবার নির্দিষ্ট ধরনের কোন ব্যবহারকারীর চাহিদামত
সফটওয়ার যুক্ত করে বানানো হয় যেমন সায়েন্টিফিক লিনাক্স, ফেডোরা
ইলেক্ট্রনিক ল্যাব ইত্যাদি। নাম দেখেই বোঝা যাচ্ছে কাদেরকে লক্ষ্য করে
এগুলো বানানো হয়েছে। তাই লিনাক্স-বেজড অপারেটিং সিস্টেমগুলোকে “লিনাক্স
ডিস্ট্রিবিউশন” বা “লিনাক্স ডিস্ট্রো” বা সংক্ষেপে শুধু “ডিস্ট্রো” বলা
হয়ে থাকে।
লিনাক্সভিত্তিক এই অপারেটিং সিস্টেমের সবগুলোই কিন্তু উবুন্টুর মত
একেবারে ফ্রি বা বিনাপয়সায় পাওয়া যায়না। যেমন রেডহ্যাট লিনাক্স ও স্যুযের
কথাই ধরা যাক- এগুলো কিন্তু টাকা দিয়ে কিনতে হয়। তবে হোম ইউজারদের জন্য
রেডহ্যাট লিনাক্সের একটা বিনাপয়সার ভার্সন আছে- তার নাম ফেডোরা। সাধারণত
রেডহ্যাট কোম্পানী তাদের রেডহ্যাট লিনাক্স অপারেটিং সিস্টেমের জন্য
ফেডোরাকে টেস্টবেড হিসেবে ব্যবহার করে। এর মানে হচ্ছে রেডহ্যাট কম্পানি
নতুন নতুন সফটওয়্যারগুলো প্রথমেই রেডহ্যাট লিনাক্সে না দিয়ে আগে ফেডোরাতে
দেয়, তারপর ব্যবহারকারিদের বিভিন্ন অভাব-অভিযোগ-মতামতের ভিত্তিতে পরে
রেডহ্যাট লিনাক্সে সেগুলোকে যোগ করা হয়। অর্থাৎ এক্ষেত্রে ফেডোরা হচ্ছে
অনেকটা গিনিপিগের মত, যার উপর বিভিন্ন পরীক্ষা চালিয়ে স্বিদ্ধান্ত নেয়া হয়
যে রেডহ্যাট লিনাক্সকে কিভাবে কি করা হবে। রেডহ্যাটলিনাক্স ও ফেডোরা একই
কম্পানির তৈরি হলেও এরা দুটি ভিন্ন অপারেটিং সিস্টেম। ঠিক একইভাবে নভেল
কম্পানির ক্ষেত্রে স্যুযের টেস্টবেড ভার্সন ওপেন স্যুযে বিনাপয়সায়
ব্যবহারের জন্য পাওয়া যায়।
